ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল অ্যাক্ট

যুক্তরাষ্ট্র থেকে অবৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ার আশঙ্কা

যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রবাসীদের রেমিট্যান্স পাঠানোর ওপর কর আরোপের পদক্ষেপ নিচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রবাসীদের রেমিট্যান্স পাঠানোর ওপর কর আরোপের পদক্ষেপ নিচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিশ্লেষকদের একটি অংশ বলছে, মাল্টিবিলিয়ন ডলারের পদক্ষেপটি নেতিবাচক দিক রয়েছে, যা দরিদ্র মধ্য আমেরিকান পরিবারগুলোকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করবে। পাশাপাশি অভিবাসীদের অনানুষ্ঠানিক বা গোপন ও অবৈধ পথে দেশে আয় পাঠানোয় বাধ্য করতে পারে বিলটি। সেসব অনানুষ্ঠানিক পদ্ধতির বেশির ভাগই নিয়ন্ত্রণের বাইরে। খবর এফটি।

মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ গত বৃহস্পতিবার ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল পাস করেছে। এখন সিনেটে অনুমোদন ও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাক্ষর নিশ্চিত হলে এটি আগামী জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে। এ ট্যাক্স বিল অনুসারে, মার্কিন নাগরিকত্ব বা জাতীয়তা নেই এমন যে কারো অন্য দেশে অর্থ পাঠানোর ওপর ৩ দশমিক ৫ শতাংশ কর প্রযোজ্য হবে।

ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, বিগ বিউটিফুল ট্যাক্সের লক্ষ্য হলো অবৈধ অভিবাসন বন্ধ করা। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ অনিবন্ধিত অভিবাসীকে বহিষ্কারের পরিকল্পনা করেছে কর্তৃপক্ষ, সে বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কাজ করবে এ বিল।

বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, বিশ্বে সবচেয়ে বড় প্রবাসী আয়ের উৎস যুক্তরাষ্ট্র। এখান থেকে ২০২৩ সালে ৬৫ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের বেশি অর্থ বিদেশে পাঠানো হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কড়াকড়ি সত্ত্বেও বর্ধিত কর এড়ানোর একাধিক উপায় রয়েছে। মার্কিন নাগরিকত্ব রয়েছে এমন বন্ধু বা আত্মীয়ের মাধ্যমে অর্থ পাঠাতে পারেন অভিবাসীরা। ক্রিপ্টোকারেন্সি, এমনকি মিউলের মতো অনানুষ্ঠানিক নগদ অর্থ ব্যবস্থাকে ব্যবহার করতে পারেন তারা। মিউল বলতে সাধারণত এমন ব্যক্তিকে বোঝানো হয়, যিনি সীমান্ত পেরিয়ে নগদ অর্থ বা মূল্যবান সামগ্রী এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গোপনে বহন করেন।

কয়েক বছর ধরে মার্কিন নীতিনির্ধারকরা রেমিট্যান্স পাঠানোর আনুষ্ঠানিক চ্যানেলগুলোকে আরো প্রতিযোগিতামূলক করে তোলার চেষ্টা করছেন। নতুন বিলের কারণে রেমিট্যান্সের খরচ বাড়াবে এবং এতদিনের প্রচেষ্টা বিঘ্নিত হবে বলে ধারণা অনেকের।

একে ‘মূলত দরিদ্রদের ওপর ট্যাক্স’ বলে অভিহিত করেন ওয়াশিংটনভিত্তিক মাইগ্রেশন পলিসি ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু সিলি। তার মতে, নতুন রেমিট্যান্স ট্যাক্স শুধু বিদেশীদের জন্য বোঝা নয়, মার্কিন নাগরিকরাও এ নিয়মের কারণে প্রশাসনিক ঝামেলায় পড়বেন। কারণ প্রতিবার অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে তাদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করে ট্যাক্স রিফান্ড দাবি করতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে অন্যতম রেমিট্যান্স গ্রহণকারী দেশ মেক্সিকো, যেখানে গত বছর প্রায় ৬ হাজার ৫০০ কোটি ডলার পাঠানো হয়েছে। রেমিট্যান্সের এ আকার দেশটির জিডিপির প্রায় ৪ শতাংশ এবং প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের (এফডিআই) তুলনায়ও বেশি। মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউডিয়া শেইনবাউম এরই মধ্যে একাধিকবার ওয়ান বিগ বিউটিফুল ট্যাক্স বিলের প্রতিবাদ করেছেন এবং চলতি মাসের শুরুতে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে আলোচনার জন্য সংসদীয় প্রতিনিধি দলও পাঠিয়েছিলেন।

তবে এ ট্যাক্স মেক্সিকোর চলতি হিসাবে অল্প প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন ব্যাংক বিবিভিএর অর্থনীতিবিদরা। গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর লাতিন আমেরিকান মনিটারি স্টাডিজের প্রধান অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানবিদ হেসুস সেরভান্তেস গনজালেসের মতে, ট্যাক্স বাবদ খরচ বহন করেও পরিবারের জন্য অর্থ পাঠানো সক্ষম মেক্সিকান অভিবাসীরা। দেশটিতে রেমিট্যান্স প্রবাহে উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়বে না।

অন্যদিকে মধ্য আমেরিকার ক্ষেত্রে চিত্রটা আলাদা। এল সালভাদর, গুয়াতেমালা ও হন্ডুরাস এ তিন দেশের জিডিপির কমপক্ষে এক-পঞ্চমাংশ রেমিট্যান্সনির্ভর। অথচ এ অঞ্চলের রাজনীতিবিদরা এখনো প্রকাশ্যে বিষয়টি নিয়ে মুখ খোলেননি। পরামর্শক সংস্থা ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের উদীয়মান বাজার বিভাগের প্রধান অর্থনীতিবিদ উইলিয়াম জ্যাকসনের মতে, রেমিট্যান্স প্রবাহ কমলে এসব দেশে অভ্যন্তরীণ আয় ও ভোগ ব্যয় কমবে এবং চলতি হিসাবের অবনতি ঘটবে।

প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল, রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ হারে কর আরোপ হবে। এ হিসাবে মার্কিন জয়েন্ট কমিটি অন ট্যাক্সেশন পূর্বাভাস দিয়েছে, ২০৩৪ সালের মধ্যে প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি ডলার আদায় করা সম্ভব হবে।

সেরভান্তেস গনজালেস বলেন, ‘গুয়াতেমালা ও হন্ডুরাসের প্রবাসীদের জন্যই সবচেয়ে গুরুতর সমস্যা তৈরি হবে। কারণ তারা আয়ের বেশি অংশই পাঠায় এবং তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা বেশ সংকটাপন্ন। ওই দেশগুলো থেকে আগত অভিবাসীদের মধ্যে অনিবন্ধিতের হার বেশি।’

তবে এ ট্যাক্সের প্রকৃত প্রভাব নির্ণয় করা কঠিন হতে পারে বলে জানিয়েছেন একাধিক বিশেষজ্ঞ। কারণ বর্তমান পরিস্থিতিতে মার্কিন রেমিট্যান্স প্রবাহে প্রভাব ফেলার মতো অনেক বিষয় রয়েছে। যেমন মার্কিন অর্থনীতির ধীরগতি, ডোনাল্ড ট্রাম্পের শপথ গ্রহণের আগেই বাড়তি রেমিট্যান্স পাঠানো অথবা অভিবাসী বহিষ্কারের তীব্রগতি।

গবেষণা সংস্থা সেন্ট্রাল আমেরিকান ইনস্টিটিউট ফর ফিসক্যাল স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক রিকার্ডো ব্যারিয়েন্তোস বলেন, ‘রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর ওপর এ ট্যাক্স বিলের কিছু প্রভাব পড়তে পারে, তবে তা হয়তো সামষ্টিক অর্থনীতিতে বড় মাত্রায় ধরা পড়বে না।’

বর্তমানে অবৈধ পথে মার্কিন সীমান্ত অতিক্রমের সংখ্যা কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে কম। এমনকি পূর্বসূরি জো বাইডেনের চেয়েও কম হারে অভিবাসী বহিষ্কার করেছেন ট্রাম্প। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, তিনি কি আদৌ প্রতিশ্রুত ব্যাপক বহিষ্কার কার্যকর করতে পারবেন? প্রশ্নটি আমলে নিয়ে রিকার্ডো ব্যারিয়েন্তোস বলেন, ‘যতক্ষণ একজন অভিবাসী যুক্তরাষ্ট্রে থাকবেন, তিনি কোনো না কোনো উপায়ে অর্থ পাঠাবেনই। কারণ সেটিই তার জীবনের চালিকাশক্তি।’

আরও